তাহলে হাসফাঁস লাগেনা কেন-লেখক সুভাষ দাস।

0
5186

সাংবাদিক নির্যাতনের আরেকটি ঘটনা ঘটেছে আমাদের দেশে। খবর বলছে প্রথম আলো পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম পেশাগত দায়িত্ব পালনকালীন সময় স্বাস্হ্য মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তারা তাঁর গলা কচেপে ধরে তাঁকে লাঞ্চিত করেছেন। এ বর্বরোচিত ঘটনার প্রেক্ষিতে মুলধারার সংবাদপত্র ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় খুব প্রতিবাদ চলছে। নিন্দা এবং প্রতিবাদ প্রকাশের তীব্র শ্লেষগুলোর অন্যতম হচ্ছে, ‘ওড়না দিয়ে রোজিনার নয় যেন টিপে ধরা হয়েছে বাংলাদেশের গলা।’
সত্যি কি তাই!
তাহলে হাসফাঁস লাগেনা কেন আমার-আমিও তো বাংলাদেশ!

গরুর গলায় যে ফাঁস লাগানো হয় সেটা ভাল করে খেয়াল করেছেন কখনও! ফাঁসটা লাগানোর আগে দড়ির গায়ে একটা মিথ্যা-গিঁট বাঁধা হয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে ফাঁসটা থাকবে ঠিকই কিন্তু সেটা যেন বজ্র আঁটুনি হয়ে গরুর গলায় চেপে না বসে- মিথ্যা-গিঁটটা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে এই যে রোজিনা ইসলামের গলার ফাঁসের কারণে বাংলাদেশ হাসফাঁস করছে না এর পেছনে কি এমন একটা মিথ্যা-গিঁট আছে! আসুন ভাবি-

মেঘ’র বয়স এখন পনের। আজ থেকে নয় বছর আগে ওর সাংবাদিক বাবা মাকে হত্যা করা হয়। ও তখন এতই ছোট যে তৎকালিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে অপরাধীদের ধরা হবে’ বলে যে মিথ্যা গিঁটটি এটেছিলেন সেটার কথা তার মনে পড়ে না। অতিক্রান্ত সময় অন্তে মেঘ এখন অনেক কিছু বোঝার মত বড় হয়েছে। অনেক হাত ঘুরে তার মা-বাবা হত্যাকান্ডের তদন্তের দায়িত্ব এখন র‍্যাব’র হাতে। ইতিমধ্যে চুড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কোর্টের কাছ থেকে আটাত্তরবার সময় চেয়ে নেয়া হয়েছে। আরও কতবার সময় চাওয়া হবে সেটা নিশ্চিত না। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা বলে চলেছেন, ‘এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর মামলা, আমরা গুরুত্বের সাথে এর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছি।’ এখন সেই মিথ্যা-গিঁটটা মেঘের চোখে ঠিকই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান ১৯৮৯ সালে। তাঁর স্ত্রীর দায়ের করা মামলার সর্বশেষ রায়টি হয় ২০১৬ সালে। এক কোটি একাত্তর লক্ষ টাকা ক্ষতিপুরণ দেয়ার কথা বলা হয় হাইকোর্ট থেকে। বছর খানেক আগের খবর হচ্ছে তখনও সাংবাদিক মন্টুর স্ত্রী রিক্ত হাতে দৌঁড়ে বেড়াচ্ছেন মিথ্যে-গিঁটটা খোলার অলিক আশ্বাসকে সামনে রেখে।

সাংবাদিকেরা মহৎ পেশার মানুষ। হত্যার শিকার হয়ে, জেল খেটে, শারিরিক নির্যাতন সয়ে পেশাটির মহত্বের দৃষ্টান্ত স্হাপনের নজির আমাদের দেশেই আছে। ৬২’র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার বিপরীতে প্রণম্য সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ‘পুর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ কিংবা নব্বই গণজাগরণের পক্ষে দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতা কাল রং’এ ঢেকে দেয়ার বিপ্লবী অবস্হান আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণে রেখেছি। আধুনিক সভ্য সাংবাদিকতার পথ কুসুমাস্তির্ণ নয়। প্রশ্ন হচ্ছে এই বন্ধুর পথ অতিক্রমে স্বার্থান্বেষীরা যে মিথ্যা-গিঁটগুলো দিয়ে রেখেছেন সেটা দেশের সাংবাদিকরা দেখতে পান কিনা! অবস্হাদৃষ্টে তেমনটি কিন্তু মনে হয় না। সাগর-রুনি হত্যার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা সাংবাদিক আন্দোলনের প্রথম সারির মুখ ইকবাল সোবহান চৌধুরীর হঠাৎ পাল্টি খাওয়া কিংবা বসুন্ধরার কর্ণধার দুশ্চরিত্র আনভীরের প্রতি সাহিত্যিক সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন নঈম নিজাম আর পীর হাবিবের অসভ্য অনুগত্য সাংবাদিকতা পেশার মহত্বের ধারনাটিকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধই করে না তাদের নেতৃত্বের প্রজ্ঞা আর দুরদর্শিতার ঘাটতিটিও প্রকটভাবে প্রকাশিত করে ফেলে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় ষাটের দশকে রাজশাহির একটি সাংবাদিক সভায় মানিক মিয়ার একটি বক্তব্য- ‘সংবাদপত্র ব্যক্তিবিশেষের মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত হইলেও জনমতের প্রতিধ্বনি না করিলে সে পত্রিকা টিকিয়া থাকিতে পারে না, ইহা অন্যান্য ব্যক্তিগত সম্পত্তির ন্যায় ব্যবহার করা চলে না।’ মানিক মিয়া বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই উল্লেখিতদের দিকে আঙুল তুলে বলতেন- দেখ স্বার্থান্বেষীদের পক্ষে এরাই হচ্ছে সেই মিথ্যে-গিঁট। এদের জন্যই সাংবাদিকতা গলায় ফাঁস নিয়ে বেঁচে আছে।

‘রোজিনা ইসলাম’ প্যাঁচ থেকে নিরাপদ এক্সিটের জন্য স্বাস্হ্য মন্ত্রনালয় একটা মিথ্যে-গিঁট খুঁজছে। এক্ষেত্রে স্বাস্হ্যমন্ত্রী পরিবহণমন্ত্রী মিলে যুগপৎ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের দিকে। তাঁরা শতাব্দী প্রাচীন অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ধুঁয়ো তুলে রোজিনা ইসলামের প্রতি ঘটে যাওয়া ক্রিমিনাল অফেন্সটিকে জাস্টিফাই করতে চাচ্ছেন। এটা করতে গিয়ে অফিসিয়াল সিক্রেট আইনটিকে তাঁরা ২০০৯-এ প্রণীত তথ্য অধিকার আইনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তথ্য প্রাপ্তির আকাঙ্খাকে অধিকারের মর্যাদা দিয়ে তথ্য অধিকার আইন নামে যে সভ্য বিধিটি প্রনয়ন করা হয়েছিল আজ একযুগ পরে এসে সেই আইনটিকে বারবনিতার কাম-নিস্পৃহ শরীর বানিয়ে দেয়া হলো।
একটা সভ্য রাষ্ট্র ব্যবস্হাপনার আয়োজন থেকে আরও কত দুরে সরে যাব আমরা?

মিথ্যে-গিঁটের নিরাপত্তায় মানুষের গলায় ফাঁস পড়িয়ে শৃঙ্খলিত দেশ চালাতে দুর্জন শাসকের ছলের অভাব হয় না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here