সমাজের মৌলিক পরিবর্তন একান্ত জরুরী – মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন।

0
4264

১ , গত ৩০ জুন ২০২২ তারিখে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আগামী ২০২২–২৩ আর্থিক বছরের জন্য সরকার নতুন বাজেট অনুমোদন দিয়ে বিল আকারে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে চুড়ান্ত অনুমোদনের জন্য। রাষ্ট্রপতি বিলে স্বাক্ষর করলেই আনুষ্ঠানিকতার পর্ব শেষ হবে। এবং ইতিমধ্যেই এইসব গতানুগতিক কর্মকাণ্ড শেষ করা হয়েছে বলে ধারণা করছি। এখন এই বাজেট অনুসর করে আগামী এক আর্থিক বছর ধরে পরিচালিত হবে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই এই নিয়ম অনুসরণ করে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এই প্রচলিত নিয়ম নিয়ে আলোচনার তেমন কিছু নেই। তবে আলোচনার বিষয় হলো অন্যান্য বিষয়গুলি নিয়ে। যেমন বাজেটের আকার কি রকম, বাজেটে আয়ের উৎস কি,কতটাকা আয় আবার কতটাকা ব্যয় । আয়ের খাতগুলি কি কি । কিংবা ব্যয়ের খাতগুলিই বা কি কি। বাজেটে কোন ঘাটতি দেখানো হয়েছে কিনা। আবার দেখানো হলে তার পরিমাণই বা কি ইত্যাদি ইত্যাদি। সুতরাং এবারে আসুন সেই বিষয়গুলি একটু বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি ।
রেডিও,টেলিভিশন,পএ পত্রিকা পড়ে কিংবা অন্যান্য মিডিয়ার কল্যাণে যতটকু জানতে পেরেছি তাতে জানা গেল বাজেটের আকার প্রতি বছরই একটু একটু করে বাড়ছে। এবারের বাজেটেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। সরকারের বাজেট পরিকল্পনার একটা মোটা দাগের চিএ আমি আমার পূর্বের লেখায় তুলে ধরেছিলাম। তাতে উল্যেখ করেছিলাম বাজেটের আকার ও প্রকারটা কেমন। স্বাধীনতা উত্তর প্রতিটি বাজেটের আকার যে ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে তার উল্যেখ করেছিলাম। অসুবিধা নেই। দিনে দিনে রাষ্ট্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, জণগনের জীবন যাএার গতি প্রকৃতি বাড়ছে, চাহিদা বাড়ছে, জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে , কাজের পরিধি বাড়ছে। সুতরাং রাষ্ট্রের বাৎসরিক বাজেটের আকার ও প্রকার বাড়বে না। এমনটা তো হয় না। কিন্তু প্রশ্নটা হলো অন্যখানে। বাজেট কতটা গণবান্ধব, কতটা উৎপাদন মুখি , কতটা উন্নয়ন মুখি , কতটা প্রগতি মুখিন ইত্যাদি।
গত লেখাতেই বলেছিলাম এবারের বাজেটের সার্বিক চিত্র হলো আয় দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। আর ঘাটতি দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। সংসদে বাজেট উপস্থাপন কালেই আমি আমার পূর্বের লেখায় এটাও উল্যেখ করেছিলাম যে কোন একটি দেশের একটি বুর্জোয়া ব্যবস্থায় প্রনিত একটি বাজেট প্রনোয়ন করা হয় সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে এবং সেই ব্যবস্থা যেন আরো টেকসই হয় এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে। সুতরাং এই ধরনের চিন্তা চেতনা থেকে উৎসারিত একটি বাজেট সাধারণ জনগনের স্বার্থে কতটুকু কাজে আসতে পারে তা পূর্ব থেকেই অনুমান করা কোন কঠিন কাজ নয়। তার পরেও কখা হলো যতক্ষন পর্যন্ত সমাজ ব্যবস্থার মৌলিক কোন পরিবর্তন না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত সেই বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার ক্রটি বিচ্চুতিগুলি আলোচনা, সমালোচনা করেই ভবিষ্যতের জন্য পথ রচনা করতে হয়। সুতরাং একটি বুর্জোয়া ব্যবস্থায় বসবাস করবো কিন্তু সেই ব্যবস্থার ক্রটি বিচ্যুতি এবং অসংগতিগুলো আলোচনা করবো না তা তো হয়না। এই আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যে দিয়েই আগামী দিনের জন্য একটি সুন্দর পথ রচনা করাই হলো মৌলিক লক্ষ্য।
যাই হোক সংসদে বাজেট বিল আকারে উপস্থাপন থেকে শুরু করে চুড়ান্ত অনুমোদনের কাল পর্যন্ত ঘটনাবলী জানার ও বুঝার চেষ্টা করেছি। কিন্তু চুড়ান্ত বিচারে যা মনে হলো তাতে এই ধারনাই পাওয়া গেল যে পূর্ব নির্ধারিত একটি নাটকের লোক দেখানো মহড়া হলো মাএ। যাহা লাউ হিসাবে সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছিল তাহা কদু আকারে নির্গত হইল।
বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য একটি দাবি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বিগত ৫০ বছরের খতিয়ান দেখলে এটা স্পষ্ট বুঝা যায় যে চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী। করোণা দূর্যোগের কারণে এবারে স্বাস্থ্য খাতের দিকে কিন্চিৎ আড় চোখে তাকালেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের দাবির সঙ্গে এটি একটি রসিকতা মাএ।
বাজেট সম্পর্কে আলোচনায় আমি আমার পূর্বের লেখায় তুলে ধরেছিলাম যে বিগত দুই বছরে দেশে করোণায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র,অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত। অথচ এবার কোভিড পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায়ও এই সব খাত খুব একটা বেশি সহায়তা পায়নি। অথচ বাজেটে কর্পোরেট করে যে ছাড় দেয়া হয়েছে তা এদের জন্য প্রযোজ্য নয়। বুর্জোয়া ব্যবস্থায় বুর্জোয়া ধারার সরকারগুলির হলো এই চরিত্র। তেলা মাথায় তেল ঢালতে এরা খুবই পারদর্শী।

দেশে এমনিতেই কর্মহীন বেকার মানুষের সংখ্যা দুই থেকে আড়াই কোটি। সেই সাথে করোণা দূর্যোগের কারণে এবারে সম সংখ্যায় আরো কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সাথে সরকার নিজেই বৈশ্বিক পরিস্থিতি তথা রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে একটি আসন্ন সংকটের জানান দিচ্ছেন। এতৎ সত্বেও আসন্ন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সরকারের প্রস্তুতি কি বাজেটে তার কোন সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে বলে মনে হয় না। উল্টো বাজেটে ঘোষণা দিয়ে জানান দেয়া হলো যে সরকার দেশের অতি দরিদ্রদের কাছে ১০ টাকা দরে মাসে যে ৩০ কেজি চাল বিক্রি করতো তা আর সেই দামে দিতে পারবে না। এখন এই চাল তাদের কে কিনতে হবে ১৫ টাকা দরে।
প্রথম আলো পত্রিকার বাজেট সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে ” করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়েনি ফলে মধ্যবিত্ত স্বস্তি পেল না ” ।
সবচেয়ে মজার খবরটি হলো স্বাধীনতার পর সর্বমোট ২১ বার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। বিগত ৫০ বছরের মধ্যে অন্তত ৪০ বারই কোন না কোন ভাবে এই সুযোগ অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলছে।
২০২১ সালের শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশীদের জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ ৮৭ কোটি ১১ লাখ সুইজ ফ্রা অর্থাৎ ৮ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালে যা ছিল ৫৬ কোটি ২৯ লাখ সুইজ ফ্রা অর্থাৎ ৫ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ২ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা অর্থাৎ ৫৫ শতাংশ।
এতসবের পরেও এবারের বাজেটে আবারও বলা হয়েছে টাকা পাচার করলে ৭ শতাংশ কর দিয়ে তা ফিরিয়ে আনা যাবে। অথচ দেশের মধ্যে বৈধ ভাবে ব্যবসা করে কর দিতে হয় ২৫ শতাংশ। কি হরিলুট কান্ড এবার ভাবুন সবাই।

২, অতি সম্প্রতি সরকার ঘটা করেই দেশের বিদ্যুৎ নিয়ে কিছু সংকটের কথা জানান দিয়েছে। সংকটটি কি ? সংকটি হলো সরকার এতদিন সম্পূর্ণ ভাবে একটি আমদানী নির্ভর জ্বালানি নীতির উপর দাঁড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটি চমক দেখাতে চেয়েছিল। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে লাভবান হয়েছে এক শ্রেণীর অসাধু সুযোগ সন্ধানী ।লুটে নিয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা । অথচ এই সব গণস্বার্থ বিরোধী কর্মকান্ড আড়াল করে সরকার এখন উদর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে । সরকারের এখন একটাই ভাস্য ইউরোপে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর করে তুলেছে । এই জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে শ্লোথগতি নেমে এসেছে। সুতরাং প্রঙ্গাপন জারি করা হয়েছে বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছতা চাই। কিন্তু প্রশ্নটা হলো বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ নিয়ে অনেক তেলেজমাতি কান্ড হয়েছে। এই সরকার ক্ষমতায় এসেই প্রথমে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে কাজ শুরু করে দেয়। তার পর রেন্টাল, কুইক রেন্টাল ইত্যাদি নানা ধরনের কসরৎ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নানা উদ্যোগ নেয়ার ফিরিস্তি দিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে জনগণকে খুশির জোয়ারে ভাসিয়ে দিলেন। কিন্তু আসলেই যে সেই সব ঢাকঢাক গুড়গুড় আওয়াজের পিছনে সরকারের কতকগুলি অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড জড়িয়ে ছিল তা আজ জনগণ হাঁড়ে হাঁড়ে উপলব্ধি করতে পারছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোন পদ্ধতি টেকসই আর কোন পদ্ধতি টেকসই নয় এই সব বাছ বিচার না করেই কেবলমাত্র আমলাগোষ্ঠীর পরামর্শ অনুসরণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চমক দেখাতে গিয়ে সরকার এখন নিজেই ফাটা বাঁশে আটকে গেছে।

আমদানী নীতির প্রতি সরকারের অতি মাত্রায় আর্কষন দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে হাতে পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ থাকার পরেও সরকার সেই দিকে মনোযোগী না হয়ে কেবলমাত্র আমলাগোষ্ঠীর পরামর্শ নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভ্রান্ত নীতির মালা জপতে গিয়ে বিদ্যুৎ খাতকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। আর এখন জনগণের উপর বিদ্যুৎ ব্যবহারের কৃচ্ছতা সাধনের নছিহত করছে।
গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে অকেজো ও দুর্বল করে রাখা হয়েছে। অথচ সরকার যত সময় ধরে ক্ষমতায় আছে সৎ ইচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে এই প্রতিষ্ঠানটিকে এতদিনে একটি সবল ও সক্ষম প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু সরকার তার ভ্রান্ত নীতির কারণে সেই সুযোগ গ্ৰহন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

৩, অতি সম্প্রতি দেশের ভিতরে শুরু হয়ে গেছে আরেক কলের গানের ভাঙ্গা রেকর্ডের গান। ধর্ম গেল,ধর্ম গেল বলে চিৎকার করতে করতে এক শ্রেনীর তথাকথিত মোল্যাগোষ্ঠী দেশটাতে একটা নতুন ধারার তেলেজমাতি কর্মকাণ্ড শুরু করে দিয়েছে। তাদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে তারাই হলো ধর্মরক্ষার একমাত্র পাহারাদার আর বাকি সব জনগোষ্ঠী তাদের হুকুম তামিলকারী খেদমতগার। তারা যখন যেটা ভাববে, কিংবা যখন যেটা নিয়ে হুংকার দিবে বাকিরা সবাই ভেড়ার পালের মত হুড়হড় করে তাদের পিছু পিছু ছুটে চলবে।
অতি সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের নড়াইল জেলায় খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি লোমহর্ষক ও ন্যক্কারদনক ঘটনা ঘটে গেল। ঘটনাটা কি? ফেসবুকে ষ্টেটাস দিয়ে নবী মোহাম্মদ (সাঃ ) এর নামে মিথ্যাচার করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মের উপর অবমাননা করা হয়েছে। সুতরাং এখন করণীয় কি সবাই চল হিন্দুদের ঘরবাড়ি লুটপাট করতে হবে, ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে হবে, এরা মালাউন, এরা কাফের, এই দেশের ভিতরে তাদের থাকার অধিকার নেই, এদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে।

ফেসবুকের কল্যাণে দেখতে পেলাম হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, এক মহিলা অসহায়ের মত হাউমাউ করে কান্নাকাটি করছে, দুই একজন পুরুষ মানুষ বালতি দিয়ে পানি ছিটিয়ে আগুন নিভানোর অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছে। তার কিছু পরের দৃশ্যটা আবার ঐ ফেসবুকের কল্যাণেই দেখা গেল সব পুড়ে ছাই, ধ্বংস স্তুপের পাশে দাঁড়িয়ে এক রমনীর আর্তনাদ। এই ধরনের ঘটনা যে এবারের মতো প্রথম ঘটলো বিষয়টা তো এমন নয়। ধারাবাহিক ভাবে এই সব অমানবিক ও ভয়ংকর ঘটনা ঘটেই চলেছে। রামু,ব্রাম্মণবাড়ীয়া, নাসির নগর, পীরগঞ্জ, নোয়াখালী এমনি করে ঘটতে ঘটতে সর্বশেষে এই নড়াইল। ঘটনা যখন ঘটে তখন ক্ষমতাসীনদের কত দৌড় ঝাঁপ,কত বক্তৃতা বিবৃতির ফুলঝুরি। তার পর ধীরে ধীরে সব স্তমিত হয়ে যায়। ঘটনার শেষ কি দাঁড়ালো, ঘটনার নেপথ্যের কুশিলব এরা কারা,কতজন অপরাধীর দন্ড হলো, শান্তি সৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার কতটুকু টেকসই উদ্যোগ নিল জনগণ কিছুই জানতে পারলো না। তার পর কিছু সময় দমধরে কুশিলবরা একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার নতুন সাজে সজ্জিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো আরো কোন নতুন নাটকের মঞ্চায়নে। এই খেলা চলছে অবিরাম।

৪, পদ্মা সেতু নিয়ে শুরু হয়ে গেছে আর এক মহা উৎসব। সরকার আনন্দে আত্মহারা। আনন্দ হওয়ারই কথা। বিশ্বব্যাংক, আই এম এফ, এডিবি সবার শত বাধা উপেক্ষা করে সরকার দেশীয় অর্থায়নে এত বড় একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ফেললো। বিষয়টা তো অবশ্যই গর্বের। নদী পারাপারের এখন আর তেমন ঝুকি ঝামেলা নেই। এবারের ঈদে মানুষ দলবেঁধে হৈ হুল্লোড় করে পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে গ্ৰামের বাড়িতে গিয়ে ঈদ উদযাপন করে সেতু পারাপারের স্বাদ এবং গ্ৰামীণ পরিবেশে পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পেরে নিশ্চয়ই আনন্দিত। সুতরাং যে যাই বলুক আমি বিষয়টি অত্যন্ত হ্নষ্টচিত্তেই গ্ৰহন করেছি। কিন্তু আমার প্রশ্নটা হচ্ছে অন্য যায়গায়। সরকার বড় সেতু বানাচ্ছে, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে রাস্তা বানাচ্ছে, উড়াল রেল লাইন বসাচ্ছে, আবার শুনছি পাতাল রেলের পরিকল্পনা গ্ৰহন করা হয়েছে, রাস্তাঘাট প্রসস্থ করা হচ্ছে, সমুদ্র বন্দরের প্রসস্তি করণের কাজ চলছে, বিতর্ক সত্ত্বেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে, দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন মূলক নানা ইতিবাচক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও সরকারের এই ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকান্ডের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা মহলের মধ্যে নানা গুঞ্জন, নানা সন্দেহ আছে তার পরেও বলতে হয় চোখ ধাঁধানো দৃশ্যমান কিছু কর্মকাণ্ড দেশে হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্নটা হলো অন্যখানে। সরকার কি তার এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে জনগণকে ভুলিয়ে রাখতে পারবে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে কেবল মাত্র কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নই কি যথেষ্ঠ । কেননা মানুষের জীবনের মৌলিক দাবীকে পাশ কাটিয়ে কেবলমাত্র কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন কোন উন্নয়ন নয়। মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান,শিক্ষা, চিকিৎসা এই সব মৌলিক দাবীকে পাশ কাটিয়ে কেবলমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন জনজীবনের শুখ শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যা লক্ষ্য করছি বুর্জোয়া ধারার রাজনৈতিক দলগুলি অত্যান্ত সুকৌশলে জনজীবনের মৌলিক দাবীগুলিকে পাশকাটিয়ে কেবলমাত্র দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চায়। যা সোনার পাথর বাটির মতোই একটি কাল্পনিক চিন্তা মাএ। কিন্তু আমারা আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে যা দেখি শুধু আমাদের দেশে নয় এটা সারা বিশ্বের একটি চলমান ধারা। বুর্জোয়া ব্যবস্থায় যার কোন মৌলিক সমাধান সম্ভব নয়। সমস্যার মৌলিক সমাধান আনতে হলে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তনের লক্ষ্যে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বিকল্প কোন সঠকাট পথ নেই।

লেখক ঃ
মোহাম্মদ আলতাফ হোসাইন।
সদস্য, সিপিবি।

( গত ৩১ জুলাই ২০২২ তারিখে সাপ্তাহিক একতা পত্রিকায় প্রকাশিত ) ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here